অস্ট্রেলিয়ায় ৩২ ঘণ্টার ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনে আলাদা হওয়া বাংলাদেশী জোড়-যমজের দুজনই এখন ভাল আছে৷ অপারেশনের প্রায় তিনদিন পর শুক্রবার সংজ্ঞা ফিরে পেতে শুরু করে এবং চোখ মেলে তাকায় কৃষ্ণা৷
অপর বোন তৃষ্ণা এর আগেই সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছে এবং স্বাভাবিক নড়াচড়ার পাশাপাশি কথাও বলছে৷
মেলবোর্নের রয়্যাল চিলড্রেন্স হসপিটাল এক বিবৃতিতে জানায়,‘‘কৃষ্ণা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে৷ সে আগের চেয়ে আরও সচেতন, আরও বেশি করে শ্বাস নিতে শুরু করেছে এবং চোখ মেলে তাকাচ্ছে৷''
তারা আরও জানিয়েছে,‘‘তৃষ্ণা আগের মতোই ভাল আছে এবং দুটি মেয়েই গুরুতর তবে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে৷''
চিকিৎসকরা অবশ্য জানিয়েছেন, অপারেশনের প্রক্রিয়ায় তৃষ্ণার চেয়ে কৃষ্ণার ওপর দিয়ে বেশি চাপ যাওয়ায় সে একটু ধীরে ধীরে সেরে উঠবে৷
অপারেশনের সাফল্য আশ্চর্যজনক
অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ এ অপারেশনের আগে চিকিৎসকরা বলেছিলেন, দুজনেরই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র পঁচিশ ভাগ এবং দুজনেরই মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়ারও আশঙ্কা প্রায় পঞ্চাশ ভাগ৷
কিন্তু, অপারেশনে সফলভাবে আলাদা হওয়া দুই বোনই সুস্থ আছে এবং স্ক্যান করে দেখা গেছে কারোরই মস্তিষ্কে কোনো ক্ষতি হয়নি৷ এ অপারেশনকে সম্ভব করে তোলা চিকিৎসকরা নিজেরাই এ সফল্যকে আশ্চর্যজনক বলে অভিহিত করছেন৷
দুই বছরের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি
মাথার খুলি, মস্তিষ্কের একটা অংশ এবং কিছু রক্তনালি একসঙ্গে জোড়া লাগা তৃষ্ণা ও কৃষ্ণা নামের এই যমজ শিশুদুটির অপারেশনের জন্য মেলবোর্নের এ হাসপাতালটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা প্রায় দু'বছর ধরেই প্রস্তুত হচ্ছিলেন৷ এর মধ্যে তারা অপারেশনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন এবং সম্ভাব্য সব বিকল্প নিয়ে ভাবছিলেন৷ প্রয়োজন অনুসারে এ সময়ে বেশ কয়েকটি ছোট অপারেশনও করেও শিশুদুটিকে প্রস্তুত করেন তারা৷
প্লাস্টিক সার্জন টনি হোমস্ বলছিলেন, ‘‘আমাদের পরিকল্পনা এ,বি,সি ও ডি প্রস্তুত ছিল৷ এমনকী মাইক্রোসার্জনদের একটি দলও তৈরি ছিল প্রয়োজনানুসারে এসে এ প্রক্রিয়ায় যোগ দেওয়ার জন্য৷''
তিনি জানান,‘‘কিন্তু সৌভাগ্যজনকভাবে পরিকল্পনা ‘এ' সফল হয়ে যায়, যেটা অত্যন্ত আনন্দের৷''
অতিরিক্ত ত্বক ও রাবারের ম্যাট
এ অপারেশনের জন্য চিকিৎসকরা যে উচ্চপ্রযুক্তির মডেলিং অবলম্বন করেছন তাতে দারুণভাবে সহায়ক ছিল অতিরিক্ত ত্বক ও রাবারের ম্যাট৷ মেয়েদুটির মাথায় বিশেষ টিস্যু প্রতিস্থাপন করে কয়েক মাস ধরে অতিরিক্ত ত্বক জন্মানোর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছেন তারা৷ যাতে, অপারেশনের পর খুলির কেটে ফেলা অংশ ওই ত্বক দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়৷
একইভাবে সাধারণ রাবারের ম্যাট দিয়ে তৈরি বিশেষ বিছানা বা আসনটিও ছিল এ অপারেশনে চিকিৎসকদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক৷ তারাই বিশেষ মডেলে এ আসনটি বানিয়েছিলেন এই জোড়-যমজকে অপারশেনের এই দীর্ঘ সময় ধরে যথোপযুক্তভাবে শুইয়ে রাখতে৷
অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যেতে পারে তারা
তৃষ্ণা ও কৃষ্ণার আইনি অভিভাবকরা জানিয়েছেন চিকিৎসা এবং অন্যান্য সহায়তার কারণেই কমপক্ষে আরও দুবছর অস্ট্রেলিয়াতেই থেকে যেতে পারে তারা৷ এমনকী ওদের অস্ট্রেলীয় অভিভাবক ময়রা কেলি তাদের দত্তক নিতে পারেন বলেও কথা হচ্ছে৷ আর সেক্ষেত্রে তাদের সেখানে থাকাটা অনেক সহজ হবে৷ তবে অপর আইনি অভিভাবক আতম রহমান জানান এসবই নির্ভর করছে আইন এবং তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর৷
জন্মের পরপরই এই জোড়-যমজকে ঢাকার একটি এতিমখানায় দেওয়া হয়েছিল৷ কিছুদিন পর প্রায় মুমুর্ষূ অবস্থায় চিলড্রেন ফার্স্ট ফাউন্ডেশন (সিসিএফ) তাদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যায়৷
প্রতিবেদক: মুনীর উদ্দিন আহমেদ
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক