৬০-এর দশকে যে স্লোগানটি সারা বিশ্বকে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা হল ‘যুদ্ধ নয় ভালবাসা’৷ আজ পাকিস্তানের থিয়েটার শিল্পীদের আহ্বান হল ‘যুদ্ধ নয় থিয়েটার’৷ এক্ষেত্রে থিয়েটারনির্মাতা ফায়সাল মালিক-এর নাম উল্লেখযোগ্য৷
ফাইল ফটো
নারী নির্যাতন, পথশিশু, এইডস রোগ এসব বিষয় নিয়ে তিনি উপহার দিয়েছেন বহু নাটক৷ পেয়েছেন ভূয়সী প্রশংসা৷
প্রথম দিকে সাধারণ থিয়েটার বলেই মনে হবে এই নাটকের কাহিনি৷ এক জোড়া তরুণ তরুণীর প্রেমের গল্প৷ সমাজের ভয়ে যাদের গোপনে দেখা সাক্ষাৎ করতে হয়৷ এক ধনী জমিদার একথা জানতে পেরে কট্টর ইসলামপন্থী এক মোল্লাকে দায়িত্ব দেন তাদের কাছে অবৈধ মনে হওয়া এই সম্পর্কের একটা বিহিত করতে৷ মোল্লা তরুণীর অশিক্ষিত ভাইকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, পারিবারিক সম্মান রক্ষার জন্য বোনকে হত্যা করাও তেমন কোন অপরাধ নয়৷ বোন তার শত্রু নয়৷ কিন্তু আশে পাশের মানুষরা তার এই প্রেমকাহিনি নিয়ে যে ভাবে গালগল্প করছে, তাকে হত্যা করা ছাড়া উপায় দেখে না ভাই৷ অবশেষে একটি ছুরি বের করে বোনকে হত্যা করে ভাই৷
থিয়েটারের এই গল্প পাকিস্তানে এখনও বাস্তব সত্য৷ বলেন প্রধান চরিত্রে রূপদানকারী মালিহা হায়দার৷ পাকিস্তানে মেয়েদের কোনো অধিকার নেই৷ আত্মবিশ্বাসী এই ছাত্রী পোশাক আশাকে আধুনিক৷ জিন্সের প্যান্ট ও টি শার্ট পরেন৷ ‘কালো রশ্মি' এই নাটকটিতে দরিদ্র এক মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়েছে তাকে৷
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নাটকের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে সমাজে মেয়েদের স্থান নিয়ে৷ কড়া অনুশাসনের সীমানায় আবদ্ধ মেয়েরা৷ এমনকি মানুষের মত আচরণও করা হয়না তাদের সাথে৷ তাই তো আমরা কবিতার মাধ্যমে বলি, আমি এক নারী কোনো পণ্য নই৷ অনেক হয়েছে এখন ক্ষান্ত দাও৷''
ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মালিহা হায়দার ও তাঁর থিয়েটারগোষ্ঠী পাকিস্তানের নব্য থিয়েটারসংস্কৃতির ধারকদের অন্যতম৷ যারা দর্শকদের সমালোচনামুখী চিন্তা ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং অহিংস এক সমাজ প্রতিষ্ঠায় উদ্দীপিত করে৷ এসব থিয়েটার পরিবেশনায় অনেক সময় দর্শকদেরও সম্পৃক্ত করা হয়৷
পরিচালক ফায়সাল মালিক গত দুই বছরে অন্তত ২৪টি নাটক মঞ্চস্থ করেছেন৷ নাটকের কাহিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে নেয়া৷ যেমন তিনি তুলে ধরেছেন বস্তিবাসীদের জীবনসংগ্রাম, নারী বৈষম্য, পথশিশুদের করুণ চিত্র ইত্যাদি ৷ ফায়সাল মালিকের নাটকে ফুটে ওঠে ভাল ও মন্দের টানাপোড়েন৷ যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে, সেখানেই নাটকের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছেন তিনি৷ এপ্রসঙ্গে মালিক বলেন, ‘‘মানুষের জীবনযাত্রা এমনিতেই ভাল নয়৷ সন্তানদের স্কুলে পাঠাবার মত অর্থও নেই অনেকের৷ এসব বিষয় নিয়ে আমরা থিয়েটার করি৷ দৃষ্টি আকর্ষণ করি মানুষের৷ আমরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বস্তিবাসীদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করি৷ আর তাই নিয়েই আমাদের লেখকরা গল্প লেখেন৷''
এখন পর্যন্ত সারা দেশে তাঁর থিয়েটার খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি৷ বলেন ফায়সাল মালিক৷ অবশ্য দর্শকরা তাঁর নাটকগুলোকে খুব ভালভাবেই নিয়েছেন৷ কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানোর জন্য তাঁর থিয়েটারগোষ্ঠীর যথেষ্ট অর্থ নেই ৷
ফায়সাল মালিক জোর দিয়ে বলেন, ‘‘আমরা বস্তি এলাকায় কাজ করতে আগ্রহী৷ শুধু রাজধানী নয়, আমরা সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও কাজ করতে ইচ্ছুক৷ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি কোটি কোটি টাকা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঢালছে৷ কিন্তু আমি বুঝিনা, কেন তারা সংস্কৃতির জন্য এই অর্থ ব্যয় করেনা৷ কেননা থিয়েটার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে৷ এর ফলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, শান্তির এক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে৷''
প্রতিবেদক: রায়হানা বেগম
সম্পাদনা: আবদুস সাত্তার