জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বা সাবেক পূর্ব জার্মানিতে সব কিছুর মত সংগীতকেও সেন্সরের কবলে পড়তে হয়েছে সবসময়৷ বিখ্যাত শিল্পীদের সংগীতও রেহাই পায়নি সেন্সরের কাঁচি থেকে৷
তবে কেউ কেউ সুকৌশলে সরকারি রেকর্ড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘আমিগার' তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে চেয়েছেন৷ আর তাঁদেরই একজন আঙ্গেলিকা ভাইৎস৷
‘‘কে আমাকে নিষেধ করতে পারে গান গাইতে? তা তো একেবারেই সম্ভব নয়,'' বলেছেন আঙ্গেলিকা ভাইৎস৷ অন্য কোনো পেশার কথা চিন্তাই করেননি তিনি৷ গানই তার জীবন৷ ভাইমার শহরে গানের ওপর পড়াশোনা করার পর ব্লুসব্যান্ডে গায়িকা হিসাবে যোগ দেন তিনি৷ তাঁর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে জ্যাজ সংগীতের ‘গুন্টার ফিসার ব্যান্ড' দলে নিয়ে আসেন এই গায়িকাকে৷ খ্যাতনামা এই ব্যান্ডের সাথে তিন বছর গান গেয়েছেন আঙ্গেলিকা৷
১৯৮৬ সালে নতুন আঙ্গিকে নিজস্ব কিছু করার কথা চিন্তা করেন তিনি৷ গড়ে তোলেন ‘গুড ভাইব্রেশন অর্কেস্ট্রা'৷ নিজস্ব আঙ্গিকে সৃষ্টি করেন জ্যাজ ও রকের এক অপূর্ব মিশ্রণ৷ গানের কথা ইংরেজিতে৷ কিন্তু তারপর থেকেই সেন্সর কর্তৃপক্ষের হয়রানির শিকার হতে হয় তাঁকে৷ আঙ্গেলিকা বলেন, ‘‘গানের কথা ইংরেজিতে? অসম্ভব৷ মঞ্চে যার যা ইচ্ছে করতে পারে, কিন্তু গানের রেকর্ড বের করতে চাইলেই যত সমস্যা৷''
আঙ্গেলিকা ভাইস তার গানের রেকর্ড বের করার জন্য ‘আমিগা'র প্রধান রেনে ব্যুটনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন৷ কিন্তু ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরতে হয় তাঁকে৷ আঙ্গেলিকা জানান, ‘‘ব্যুটনার বলেন, এটা অসম্ভব৷ রক সংগীত জগতে জার্মান ভাষার রয়েছে এক বিশেষ স্থান৷ তা আমি ধ্বংস করতে দিতে পারিনা৷ তখন আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনার যদি তাই মনে হয় তাহলে আমাদের মধ্যে আর কোনো কথাবার্তা চলতে পারেনা৷''
কিন্তু রেকর্ড বের করতে না পারলেও আঙ্গেলিকা ভাইসের ‘গুড ভাইব্রেশন অর্কেস্ট্রা' ১৯৮৮ সালে এক পপ সংগীত উৎসবে আমন্ত্রিত হয়৷ আঙ্গেলিকা এই অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, আমিগা এমনভাবে কাজ করছে যে তার সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়৷ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের কানে যায় তাঁর এই অভিযোগ৷ এর পরের ঘটনা অবিশ্বাস্য৷ কয়েকদিন পর জানানো হল যে, তার গানের রেকর্ড তৈরি করা যেতে পারে৷ আঙ্গেলিকা ভাবলেন, হয়তো বা কর্তৃপক্ষ শঙ্কিত৷ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় খ্যাতনামা অনেক শিল্পীই পশ্চিমে পাড়ি দিয়েছেন৷ যদি আরো শিল্পীকে হারাতে হয়!
অবশ্য তাঁকে ইংরেজি ভাষায় গান গাইবার অনুমতি দেয়া হলেও কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়৷ দুটো গান জার্মান ভাষায় হতে হবে, যাতে থাকবে স্বদেশের কথা৷ সাথে সাথে আঙ্গেলিকা ভাইসের মনে পড়ে গেল ‘উনজেরে হাইমাট'- ‘আমাদের স্বদেশ' গানটির কথা৷তিনি বলেন,‘‘আমরা সবাই স্কুলে এই গানটি শিখেছি৷ সেই সময় গানটির বেশ একটা দেশপ্রেমমূলক অর্থ ছিল৷ সময়ের সাথে সাথে তা পরিবেশপ্রেমের গানে পরিণত হয়েছিল৷''
আঙ্গেলিকা বলেন, আমাদের দেশ তো শুধু শহর ও গ্রাম নয়৷ আমাদের দেশ বনের গাছপালা, মাঠের ঘাসও৷
সাবেক পূর্ব জার্মানিতে যেভাবে পরিবেশ দুষণ হচ্ছিল, তাতে এই গান যেন এক প্রতিবাদ সংগীতে পরিণত হয়েছিল৷ আঙ্গেলিকা এতে নিজের কিছু কথা জুড়ে দিলেন: ‘‘সেসব কোথায় গেল, আমাদের সুন্দর দেশটি, যাকে আমরা এত ভালবাসি...''
প্রথম দিকে সব ভালভাবেই এগুচ্ছিল৷ রেকর্ডও তৈরি হল৷ কিন্তু হঠাৎ করেই সে গুলো অদৃশ্য হয়ে গেল৷ এবং আঙ্গেলিকাকে দোষারোপ করা হল যে, তিনি জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিশেষ অর্থবহ দেশাত্মবোধক গানটিকে নষ্ট করেছেন৷
দুই জার্মানির পুনরেকত্রীকরণের পর ‘উনজেরে হাইমাট' গানটির রেকর্ড বের করেন আঙ্গেলিকা নিজেই৷ কিন্তু তেমন কোনো ফিডব্যাক পাননি, যেমনটি তিনি সাবেক পূর্ব জার্মানিতে অভ্যস্ত ছিলেন৷ আঙ্গেলিকা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘‘আমাদের পুবের মানুষদের কাছ থেকে কেউ কিছু শুনতে চাননি৷ এটা অবশ্য আমি বুঝি৷ কেননা সবার তখন পরিস্থিতি দেখে শুনে নিতে হচ্ছিল৷''
আঙ্গেলিকাকেও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়৷ তাঁর ব্যান্ডের নতুন নাম দেন ‘লাউড পিওপিল'৷ সংগীত পরিবেশন করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, থিয়েটার হলে, ফিল্ম অর্কেস্ট্রায়৷ কিন্তু গানের রেকর্ড বের করার আগ্রহটা তাঁর থেকেই যায়৷ আর তাই কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন আঙ্গেলিকা ভাইস,‘‘আমার আরও গানের রেকর্ড বের করার ইচ্ছা রয়েছে৷ কিন্তু এক্ষেত্রে বাধা অর্থের অভাব৷ আজ অর্থই হচ্ছে সেন্সর৷ যার আদলটাই শুধু বদলেছে৷''
প্রতিবেদক: রায়হানা বেগম
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক