বার্লিন প্রাচীর যখন ভাঙ্গল তখন চ্যান্সেলর হেলমুট কোল ভবিষদ্বাণী করেছিলেন যে পূর্ব জার্মানি হবে বিপুল প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল৷ ২০ বছর পর তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপান্তরিত করেছে বিটারফেল্ড৷
বিটারফেল্ডের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে কখনোই ক্লান্ত বোধ করেন না হর্স্ট টীশার৷ ৬৯ বছর বয়স্ক এই সিটি মেয়র জানান, নিঃসন্দেহে লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটেছে এই শহরের৷ প্রাক্তন প্রকৌশলী টীশারের এখনো মনে পড়ে কি দূষিতই না ছিল সাবেক পূর্ব জার্মানির এই শহরটি ৷
তিনি অবশ্য স্বীকার করছেন যে বেকার সমস্যা এখনো রয়েছে সেখানে৷ তবে তিনি শহরটির ইতিবাচক দিক নিয়েই আলোচনা বা কথা বলতে বেশি আগ্রহী৷ যেমন, গোয়েৎসে খনি৷ প্লাবিত করা হয় এই জায়গাটা এবং পরে তা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি লেকে পরিণত করা হয়৷ এর ফলে শহরটির সৌন্দর্যও বাড়ে৷
কাজের উদ্দেশ্যে শহর ছেড়ে চলে যাওয়া
বাস্তবে, বিটারফেল্ড দুই জার্মানির একত্রীকরণের পর বিভিন্ন ধরণের সমস্যায় জর্জরিত ছিল৷ ১৯৯০ সালে বেকারত্ব চরমে পৌছায়৷ প্রতি চারজনের মধ্যে একজন ছিল বেকার৷ এর ফলে পশ্চিমে পাড়ি দেয় অনেকেই৷ বিশেষ করে দলে দলে নতুন প্রজন্ম চলে যায় বিটারফেল্ড ছেড়ে, এই ঘটনা এখনো ঘটছে৷
টীশার স্বীকার করেন, এটি শহরের জন্য নিঃসন্দেহে চিন্তার কারণ৷
বিটারফেল্ডে জনসংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে৷ তা আটকাতে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেশ কিছু শহরকে একসঙ্গে যোগ করার৷ ২০০৭ সালের গ্রীষ্মে বিটারফেল্ড শহর হিসেবে মানচিত্র থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়, শহরটিকে যুক্ত করা হয় ওলফেন, গ্রেপিন, হল্সভাইসিশ, থালহাইম এবং রোডগেনের সঙ্গে এবং নাম দেয়া হয় বিটারফেল্ড-ওলফেন৷ বর্তমানে এ দুটি শহরের জনসংখ্যা ৪৫ হাজার৷ ১৯৮৯ সালে শুধু ওলফেন শহরের জনসংখ্যাই ছিল এর কাছাকাছি৷
আলোকিত দিক
মেয়র হর্স্ট টীশার উজ্জ্বল দিকগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করতে চান৷ এবং নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং আলোকিত দিক হল বিটারফেল্ড-ওলফেন কেমিক্যাল পার্ক৷ বারোশো হেক্টরের পুরোটাই৷ আয়তনে পার্কটি বিটারফেল্ডের চেয়ে বড় এবং ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ইউরো এর পেছনে খরচ করা হয়েছে৷
ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কেমিক্যাল পার্কটি সফল হয়েছে, এবং বর্তমানে সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া, চিলি, ফ্রান্স, সুইডেন, আমেরিকা এবং জাপানের প্রায় ৩৬০ টি কোম্পানির অফিস সেখানে রয়েছে৷ এছাড়া রয়েছে আকজো নোবেল, বায়ার এবং এভনিক৷ এই কোম্পানিগুলোর উপস্থিতির ফলে প্রায় ১১ হাজার মানুষকে কাজের সুযোগ করে দেয়া গেছে৷
বিশেষ একটি কোম্পানি সফল হয়েছে এবং সাফল্য দেখিয়েছে ভীষণভাবে৷ সিলিকন সোলার সেল তৈরি করার জন্য কিউ সেল কোম্পানি ২০০১ সালে মাত্র ১৯ জন কর্মী নিয়ে তার যাত্রা শুরু করে৷ ছয় বছর পর কিউ সেলের কর্মী সংখ্যা দাঁড়ায় সতেরশোতে৷ বিটারফেল্ডের এই কিউ সেল কোম্পানি বিশ্বের সর্ববৃহৎ সোলার সেল উৎপাদনকারী কোম্পানি৷
অবাক হওয়ার কিছু নেই, এই গতিতে সাফল্য পাওয়ায় স্যাক্সনি রাজ্যের অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী রাইনার হাজেলহফ অত্যন্ত প্রসন্ন৷ তিনি খুশি হয়ে কোম্পানিকে পুরস্কৃত করেছেন, সাকসেস স্টোরি – মেড ইন স্যাক্সনি পুরস্কারে৷
হাজেলহফ বিশ্বাস করেন, অন্য কোম্পানিগুলোও কিউ সেলের পদক্ষেপ অনুসরণ করবে৷ তিনি আশা করছেন হয়তো ২০১০ সালের মধ্যে আরো অন্তত পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে এই সোলার ভ্যালিতে, যা বিটারফেল্ডের অদূরে অবস্থিত৷
প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়া
কিন্তু হর্স্ট টীশার সবাইকে জানাতে চান যে শুধু কাজ এবং খেলাধুলা করে বিটারফেল্ডে সময় কাটানো হয় না৷ ইদানিং যে কারো হাতে সময় থাকলে সে চলে যায় কৃত্রিম উপায়ে তৈরি গোয়েৎসে লেকের ধারে৷
বেশ কয়েক দশকে ধরে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন গোয়েৎসে খনিতে খননের ফলে রয়ে গেছে বিশাল বিশাল গর্ত এবং উঁচু নিচু ঢিবি৷ ৯০ এর শেষের দিকে গোয়েৎসে খনিতে কাজ করা হয় ভিন্নভাবে, খনিকে জুড়ে দেয়া হয় চারটি বড় লেকের সঙ্গে, প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর এলাকায়৷ লেকের আশ পাশ দিয়েই ছুটি কাটাবার জায়গা, রেস্টুরেন্ট গড়ে তোলা হয়েছে৷ এমনকি ইদানিং শোনা যাচ্ছে বিটারফেল্ড রিভিয়েরা বা সৈকত তৈরির কথা৷
প্রশ্ন, ১৯৮৯ সালে চ্যান্সেলর হেলমুট কোল, জার্মানির পূর্বাঞ্চল প্রাচু্র্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বিটারফেল্ড কি তার কোন উদাহরণ ? পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং দুই জার্মানির একত্রীকরণের কঠিন সময় পার হয়ে হর্স্ট টীশার আজ আর রাজনৈতিক বুলি নিয়ে কথা বলতে চান না কিন্তু শহরটির ইতিবাচক পরিবর্তনে তিনি অত্যন্ত গর্বিত৷
তিনি জানান, আজকের অবস্থার সঙ্গে যদি অতীতের তুলনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে- বিটারফেল্ড কি অভূতপূর্ব এক শহরে রূপান্তরিত হয়েছে৷
ভাষান্তর: মারিনা জোয়ারদার
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক